মিলনের মহামেলায় – অম্লান চক্রবর্ত্তী

“জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ”, ফেসবুক মেসেন্জারে যখন স্টকহলম হ্যালোউইন ক্লাবের তরফ থেকে মিস রেডভিল সরিতে আমাকে স্টকহলম প্রাইড প্যারেডে যোগদানের আমন্ত্রণ জানালেন তখন আমার মনে এসেছিল রবীন্দ্রনাথের ওই গানটিই। আমন্ত্রণ শব্দটির ব্যাখ্যা পরে করছি আগে প্রাইড প্যারেডের বিষয়টি বলি।

সমকামী ও রূপান্তরকামীদের সমানাধিকারের দাবিতে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই (রাশিয়া, চীন, আরব দুনিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশ বাদে) বড় বড় শহরগুলিতে প্রাইড প্যারেডের আয়োজন করা হয়। LGBT অর্থাৎ Lesbian, Gay, Bisexual, Transsexual সকলের সমান অধিকার, বাঁচার ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠাই এর উদ্দেশ্য। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ এখানে যোগদান করেন। লক্ষ্য একটাই – সকলের বাঁচার ও ভালোবাসার অধিকার। এই আন্দোলনের পতাকা রঙধনু রঙের।

যদিও ইউরোপ প্রাইড প্যারেড পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম, কিন্তু এই আন্দোলনের আঁতুরঘর মার্কিন মুলুকে। ১৯৬৯ সালের ২৮সে জুন নিউ ইয়র্কের ঘুম ভেঙেছিল রঙধনু পতাকা দেখতে দেখতে। তারপর সেই আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। রেইনবো রঙে আমাদের প্রিয় কলকাতাও “কল্লোলিনী তিলোত্তমা” হয় বছরে একদিন।

সুইডেন জেন্ডার ইকুয়াল দেশ। এদেশে নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ, রূপান্তরকামী সকলের সমানাধিকার। দেশের সর্বত্র ইউনিসেক্সউয়াল টয়লেট। শুধু তাই নয়, এখানে সুইডিশ কার্ডের (সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড) আবেদন করার সময় স্বচ্ছন্দে আপনি সমলিঙ্গের মানুষকে স্পাউস বা লিভ ইন পার্টনার দেখতে পারেন। সমকামী বিবাহ এখানে আইনসিদ্ধ। তাঁরা কোনো শিশুকে এডপ্ট করতেও পারেন এবং শিশুটির স্কুলে পেরেন্ট হিসাবে সেই দম্পতির নাম থাকবে। রাস্তাঘাটে অসমকামীদের মতো সমকামীদেরও পরস্পরকে চুমু খেতে দেখা যায়। শুধু সমকামী, রূপান্তরকামী নয়, LGBT র সাথে এখানে intersex ও queer মিলে LGBTIQ হয়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এই সব কারণে, প্রাইড প্যারেড হল গ্র্যান্ড সেলিব্রেশান। আর প্যারেডটিও পৃথিবীর অন্যতম বড় ওয়াক।৭দিন ধরে চলা প্রাইড উইকের সমাপ্তি ঘটে অগাস্টের প্রথম রবিবার। ওই দিন ৪৫ হাজারের ও বেশি মানুষ অংশ নেন প্যারেডে। দর্শক প্রায় চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার। তাই যোগদানের জন্য হয় ইন্ডিভিজুয়ালি নাম নথীভুক্ত করতে হয় বা কোনো সংস্থার মাধ্যমে অংশ নিতে হয়। আমি নাম রেজিস্টার করতে পারিনি। তাই যোগদানের জন্য বহু সংস্থায় যোগাযোগের পর অবশেষে যখন হ্যালোউইন ক্লাবের তরফ থেকে আমন্ত্রণ পেলাম। তা ঈশ্বরের উপহার মনে হচ্ছিল।

আর ইতিহাস বলবনা। “গুগুলং শরণাং গচ্ছামি” করলে আরো অনেক বেশি তথ্য পাবেন। সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকি। সকাল এগারোটার সময় প্যারেড শুরু হবার কথা ছিল। ৮টা থেকে শুরু হয়ে যায় লোক সমাগম। সকল সংগঠনই তাঁদের ট্যাবলো সাজাচ্ছেন। অংশগ্রহণকারীরা কেউ কেউ মেক আপ করছেন। এমনিতেই সুইডিশরা লিঙ্গ নির্বিশেষে সাজতে ভালোবাসেন। এতো সাজতে ভালোবাসা মানুষজন পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে দেখিনি, কোথাও আছেন বলেও মনে হয় না। তবে মেক আপ খুব লাইট। প্যারেডের জন্য নিজেদের সংগঠন অনুযায়ী সাজা।

এমনিতে সময়ানুবর্তী হলে কি হবে, এই দিন দেখলাম সুইডিশরাও প্যারেড শুরু করতে ঘন্টা দেড়েক দেরী করে ফেললেন। আসলে এতো বড় কর্মযজ্ঞে এটুকু বিলম্ব হতেই পারে। যদিও শুভারম্ভ হয়ে গেছিল কাঁটায় কাঁটায়। তা অবশ্য ওই “ওং গণেশায় নমো”র মত। আসল পুজো শুরু হল সাড়ে বারোটায়। স্টার্টিং পয়েন্ট ছিল স্টকহলম সিটি হল (যেই হলে নোবেল পুরস্কারের রাতে পুরস্কার প্রাপকদের সাথে রাজা ও প্রধানমন্ত্রী নৈশভোজে যোগদান করেন)। নথীভুক্ত সব সংগঠন কে আগে থেকেই উদ্যোক্তাদের তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্যাবলোর অবস্থান কত নম্বরে আর কোথায় হবে।সেই মত আমাদের হ্যালোউইন ক্লাবের ট্যাবলো ছিল রাডহুসেটের কাছে। সিটি হল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে।

আমার “ধান্দা” ছিল গোটা মিছিলটা ঘুরে ঘুরে দেখে ছবি তোলা। ট্যাবলোয় থাকা বা প্ল্যাকার্ড ধরে চলার বান্দা আমি নই। তাই হ্যালোউইন ক্লাবের সাথে চলা তো শুরু করলাম, তারপর জুতোর ফিতে বাঁধার অছিলায় হাতের প্ল্যাকার্ডটা এক চেক তরুণীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সুরুৎ করে কেটে পড়লাম। মোটামুটি ঠিক করেছিলাম, মিছিলের সামনে চলে যাব, আর তারপর ভিতর থেকে ছবি তুলবো। সেই মত এদিক ওদিক করে ভীষণ জোরে হেঁটে আধো দৌড়ে প্রায় সামনে চলে গেলাম। এবং শুরু হল এক্সপ্লোর করা।

শুরুতে এক ব্যান্ড পার্টি। তারপর ধীরে ধীরে দেখি এই বিশাল প্যারেডে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ। এসেছেন আর্মি। তাঁদের পিছনে পুলিশদের দল। তার পর নুডিস্টরা। সম্পূর্ণ নগ্ন/ নগ্নিকা। মাথায় রংধনু টুপি বা স্কার্ফ। এঁদের পর একটি স্থানীয় ব্যান্ডের ট্যাবলো। নিজেদের গান গাইছেন। সুইডিশরা গান পাগল। এদেশেই বিখ্যাত আব্বা ব্যান্ড একসময় পৃথিবী মাতিয়েছিলো। গোটা মিছিলেই প্রচুর ব্যান্ড ও একক গায়কদের গিটার, ইউকুলেলে নিয়ে হাঁটতে, ট্যাবলোয় দেখেছি। তারমধ্যে বিখ্যাত একটি দল “উপসালা কোয়ার”, ভারতীয় পারফর্মিং আর্টের “আলেন্স গরুপ” ও এসেছিলেন। বলাই বাহুল্য, সব ট্যাবলোর গায়ে নিজেদের লোগো বা পতাকার সাথে ছিল রংধনু পতাকাও।

কিছুটা ফাঁকা জায়গা দেখে একটু চমকে গেলাম। তারপর দেখি একদল আসছেন ফুটবল খেলতে খেলতে। দেখা মাত্র দর্শকদের মধ্যে থেকে সোল্লাসে চিৎকার উঠলো। এক সহনাগরিককে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, সুইডেনের জাতীয় ফুটবল দল আসছে। বেশ কজন বিশ্বকাপারও এসেছিলেন। মাঝে মাঝেই দর্শকদের দিকে বল ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন, আবার খেলা ভক্ত সুইডিশরা হেড করে বল পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন ওঁদের দিকে। ফুটবলারদের পরে দেখি একদল নারী-পুরুষ আসছেন, বিভিন্ন কসরত দেখতে দেখতে। একজনকে দেখলাম উপরে ছুঁড়ে দিল, তিনিও আকাশে উড়ে কয়েক পাক খেয়ে আবার আরেকজনের কোলে এসে পড়লেন। বুঝলাম, এঁরা হলেন সুইডিশ জিমন্যাস্ট দলের খেলোয়াড়রা। আইস হকি স্টিক নিয়ে খেলার ভঙ্গীতে আসছিলেন জাতীয় আইস হকি দলের খেলোয়াড়রা। খুব সুন্দর লাগছিলো সাঁতারুরা আসছিলেন শূন্যে বাটার ফ্লাই স্ট্রোকের মতো করে হাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে। সকলেই যেন চাইছেন নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রাইড প্যারেডের সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক জুড়ে দিতে।

হঠাৎ দেখি রংধনুর সাথে লাল পতাকা নিয়ে এগিয়ে আসছেন এক যুবক। তিনি সুইডিশ সোশ্যালিস্ট পার্টির তরফে এসেছিলেন। যাই বলুন, লাল পতাকা উড়তে দেখে বেশ ভালোই লাগছিলো। এসেছিলেন ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও বিরোধী সুইডিশ ডেমোক্র্যাট ও গ্রীন পার্টির প্রতিনিধিরা, নিজেদের দলীয় পতাকার সাথে রামধনু পতাকা নিয়ে। কিন্তু যেহেতু সামনে ভোট, তাই একটু ইশতেহারও দিয়ে গেলেন। রাজনৈতিক নেতারা বোধ হয় সব দেশেই বেরসিক হন। এঁদের নিয়ে বেশি আলোচনা না করাই ভালো।

ধর্মীয় সংগঠন গুলির উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও পৃথিবীর সব ধর্মেই লিঙ্গ বৈষম্য ও সমকাম বিরোধিতার কথা বলা আছে, কিন্তু সুইডেনে বেশিরভাগ মানুষই নাস্তিক। ধর্মকে এখানে জনগণ ও পার্লামেন্টের কাছে নতজানু থাকতে হয়। সর্বোপরি, জেন্ডার ইকুয়াল দেশে থেকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে যেতেই হবে। তাই তাঁরাও এসেছেন। ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ধর্মের মানুষদের দেখলাম কিন্তু হিন্দু ধর্মের কোনো প্রতিনিধি চোখে পড়লনা। চিত্রাঙ্গদার ধর্মের মানুষের অনুপস্থিতিতে অবাক হলাম।

হঠাৎ দেখলাম বিশাল মিছিলের মাঝখানে আকাশে আগুনের গোলা উঠলো, পরমুহূর্তেই নিভেও গেলো। স্টকহলম ও আশেপাশের মিউনিসিপ্যালিটির ফায়ার ম্যানরা এসেছেন নিজেদের কলাকৌশল নিয়ে। গোটা প্রাইড প্যারেডে এরকম অসংখ্য সরকারী, বেসরকারী সংগঠনের মানুষকে দেখলাম। বহুজাতিক সংস্থার মধ্যে চোখে পড়লো এরিকসন, আইবিএমের প্রতিনিধিদের। এসেছিলেন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা, চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত কলাকুশলীরা।

কিন্তু যাঁদের জন্য আজ এই প্যারেডের জন্ম তাঁদের কোনো ট্যাবলো আলাদা করে দেখলাম না। জিজ্ঞাসা করতেই বন্ধু ইসাবেলা বললেন, সমকামী, রূপান্তরকামী এখানে সমাজের সমস্ত স্তরে আছেন। তাঁদের আলাদা হয়ে থাকার দরকার নেই। এটাই ইকুয়ালিটি। আর সবার ট্যাবলোতেই “সেক্স ফর অল” বা “রাইট ফর অল” লেখা আছে। এটাই সুইডিশ সমাজ।

উৎসব সর্বোচ্চতা লাভ করল যখন দেখলাম হুইলচেয়ারে বসেও মানুষ যোগদান করেছেন। “স্পেশাল চাইল্ড” দের নিয়েও বাবা-মায়েরাও হাঁটছেন। এ আনন্দ সবার। সবার গর্বের দিন। সমকামী আন্দোলনের হাত ধরে প্রাইড প্যারেড আজ সবার গর্বের উৎসব। রংধনু আজ সারা পৃথিবীর আনন্দের প্রতীক।

সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ব্যাপ্ত এই পদযাত্রার শুরুর দিকের দলগুলি যখন শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে তখনও অনেক দলের চলা শুরুই হয়নি। ধীরে ধীরে তাঁরাও শুরু করলেন। কিন্তু সব ঘটনারই (নাকি ভারতীয় হিসাবে রূপকথা বলব) শেষ থাকে। এই আনন্দযজ্ঞেরও শেষ হল সমাপ্তির অনিবার্যতায়। তখন “বিকেল” নটা। সনাতন পাঠক, ঠিকই পড়েছেন। স্টকহলম শহরে তথা মধ্য সুইডেনে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে সূর্য ডোবে সাড়ে নটার পর। বহু প্রেম গড়ে এই প্রাইড ওয়াক থেকে, ভাঙেও। শেষ হবার পর তাই গোটা অলিম্পিক স্টেডিয়াম চত্বরের বাইরেটায় মিলনমেলা। মানুষ মানুষকে জড়িয়ে ধরছেন, চুমু খাচ্ছেন, আদর করছে, কারো আবার বাড়ি ফেরার তাড়া। কারওবা অন্য কাজ। তবে স্তুরপ্লান অঞ্চলের পাবগুলি মুহূর্তের মধ্যে ভর্তি হয়ে গেলো।এবারের মত প্রাইড ওয়াক শেষ, আবার অপেক্ষা একবছরের। তবে লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সমান অধিকার নিয়ে বাঁচবেন সুইডেনে। ভালোবাসাও হবে লিঙ্গের ঊর্ধ্বে।


[চিত্র: লেখক ]

Leave a Reply

1 thought on “মিলনের মহামেলায় – অম্লান চক্রবর্ত্তী”

  1. প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের প্রগতিশীল মানসিকতার ফারাক বোঝা যায় আপনার লেখায় । LGBT নিয়ে আমাদের ছ্যুৎমার্গ আমরা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি । আপনাকে ধন্যবাদ এই অভিজ্ঞতা আমাদের জানানোর জন্য ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *