20191128_114827_0000-01.jpeg

টস – রেহান কৌশিক


জুলাই, ১৯৯৬
’মিলেছে মিলেছে মিলেছে…’ সন্ধেবেলা বাড়ির ড্রয়িংরুমে পা দিয়েই শাম্মি কাপুরের চাহে মুঝে কোই জংলি কহের স্টাইলে একটা নাচ দিল মানস। দু’আঙুলের ফাঁকে ট্রান্সফার লেটারের কপি।’সত্যি!’ ইচ্ছাপূরণের বিস্ময় স্বস্তিকার গলায়।মানস বলল, ‘নিজের চোখে দ্যাখো।’
স্বস্তিকা চোখ রাখল কাগজে। তাদের স্বপ্নের ছাড়পত্র। ট্রান্সফার হয়েছে ঘাটশিলাতেই। ওপরওয়ালার ভ্যানতাড়া দেখে মনে হচ্ছিল না শেষ অব্দি হবে। হল। অবশেষে হল।
মানসের ট্রান্সফার হতে চাওয়া নিয়ে অফিসে কম কানাকানি হয়নি! কেউ বলল, ‘নির্ঘাত বৌদির সঙ্গে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইনের কিচাইন।’ কেউ বলল, ‘স্রেফ ভীমরতি। নাহলে কলকাতার বুকে গোছানো সংসার ছেড়ে ঘাটশিলায় ট্রান্সফারের জন্য কেউ ঝুলোঝুলি করে!’
কারও কোনো কথা মানসকে টসকাতে পারেনি। এক গোঁ, ট্রান্সফার চাই। অবশেষে মিলল।
স্বস্তিকা চেয়েছিল ঘাটশিলা পৌঁছে দিয়ে পরদিন ফিরবে। মানস রাজি হয়নি। হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নড়ে উঠল এক্সপ্রেস ট্রেন। মানসের ঠোঁটে লেগে আছে ছেলেমানুষের হাসি। আর এটাই কি ভেতরে ভেতরে কোথাও নাড়া দিল স্বস্তিকাকে? কে জানে! প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকে স্বস্তিকা। ট্রেনের পিছনে হলুদকালির কাটাকুটি চিহ্ণটা ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়ার আগে কে যেন বাজিয়ে দিল মনখারাপের বাঁশি।
এপ্রিল, ১৯৭২
মানস চৌধুরি। এম.কম। পেশা টিউশন। তিন কুলে কেউ নেই। সকাল থেকে সন্ধে পায়ে হেঁটে এবাড়ি ওবাড়ি পড়ানো আর তার ফাঁকে চাকরির পরীক্ষা। স্বস্তিকা কর্মকার। মানসের ছাত্রী। কমার্সে ফাইনাল ইয়ার। মানসের পড়ানো ভালো। স্বস্তিকার হাসি সুন্দর। একদিন স্বস্তিকা বলল, ‘আমাকে কেমন লাগে?”ইয়াং ভিক্টোরিয়া।”তাহলে চলো, একদিন গড়ের মাঠে যাই।”চলো।’মানস ও স্বস্তিকা গড়ের মাঠে গেল। স্বস্তিকা মুখ নীচু করে আঙুলে বিস্তর ঘাস ছিঁড়ল। মানস তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বাতাস লেগে এলোমেলো হয়ে যাওয়া স্বস্তিকার চুলের গুচ্ছ।
দিন যায়। মাস যায়। ঋতুচক্র ঘোরে অবিরাম।
সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩
স্বস্তিকার কলেজ ফুরিয়ে এল। মানস চাকরির পরীক্ষা দেয় আর এবাড়ি-ওবাড়ি পড়ায়। একদিন স্বস্তিকা বলল, ‘বাড়িতে রাজি নয়।”সে তো হবেই। স্বাভাবিক।”তাহলে?”তুমিও লেগে পড়ো। পড়াও।’
বাড়ি ভাড়া হল। মন্দিরে সিঁদুর উঠল স্বস্তিকার সিঁথিতে। স্বস্তিকা ত্যাজ্য হল। মাস গেলে মানসের সাড়ে তিনশ। স্বস্তিকার দু’শ। সাকুল্যে সাড়ে পাঁচশ। মানস চাকরির পরীক্ষা দেয়। ফল যথারীতি শূন্য। স্বস্তিকা চাকরির পরীক্ষা দেয়। ফল সেই শূন্য।
দিন যায়। মাস যায়। ঋতুচক্র ঘোরে অবিরাম।
মে, ১৯৮০
একদিন আলো ফুটল স্বস্তিকার মুখে। চাকরি হয়েছে। সরলাবালা বালিকা বিদ্যালয়ে। স্কুলটা বেহালায়। স্বস্তিকা বলল, ‘তোমাকে আর টিউশন করতে হবে না।”ধুর এটা চলবে।’
দিন যায় মাস যায়। ঋতুচক্র ঘোরে অবিরাম।
মার্চ, ১৯৯৬
মরশুমি ফুলের চারার সঙ্গে একটা কৃষ্ণচূড়ার চারাও এনেছিল মানস। স্বস্তিকা যত্ন করে পুঁতেছিল গাছটা। নিয়মিত জল দিত। চোদ্দো বছর পর আজ সেই গাছে শালিকের সংসার। ডালে ডালে লকলকানো আগুনের রং। ইদানিং বারান্দায় বসে আগুনরংএর ফুলগুলো দেখলেই আগুনলাগার কষ্ট হচ্ছে। এই তো ক’দিন হল আন্দামান থেকে ঘুরে এল। হ্যাভলক বিচে সমুদ্রের নীলজলে পা ডুবিয়ে বসেছিল দু’জন। কই এমন কষ্ট তো টের পায়নি সেদিন! মানসকে জিজ্ঞেস করতে হবে তারও এমন কোনো ফিলিংস হচ্ছে কিনা।
নরম নীলচে আলোর রহস্যে ঢেকে আছে বেডরুম। স্বস্তিকা আলতো হাত রাখে মানসের বুকে। ‘কোনো কষ্ট হয় এখানে?”তুমি টের পেলে কী করে!’ মানসের গলায় স্পষ্ট বিস্ময়।স্বস্তিকা তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে, ‘সত্যি?”হুম। কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।”আমিও। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছি বুকের ভিতর একটা আশ্চর্য কষ্ট হচ্ছে।”হার্টের প্রব্লেম না তো? শ্বাসকষ্ট হয়?”কই না তো!”আমারও। কিন্তু কষ্টটা জেনুইন।কাল বরং কার্ডিওলজিস্ট ডা. অরিন্দম বসুর একটা এপয়েন্টমেন্ট নেব।’
ইসিজি ইকোকার্ডিওগ্রাম, এঞ্জিওগ্রাম। হার্টের যতরকম টেস্ট থাকে, সব হল। রোগ কিন্তু অধরা। ডাক্তার চেঞ্জ হল। ফল সেই এক। রোগ নেই কিন্তু বুকের ভিতর সেই আশ্চর্য কষ্ট বঁড়শির মতো বিঁধে আছে। রাত্রে মানস হাত রআখে স্বস্তিকার বুকে। সেই নীল আলো, রহস্যে মাখামাখি শোওয়ার ঘর। ‘কষ্টটা আছে?”আছে নয়, বরং বেড়েছে।”একি তবে রাজার অসুখ!”রাজার নাকি সুখের অসুখ— কে জানে!’
সুখের অসুখ কথাটা স্ট্রাইক করল মানসের। মানস উঠে গিয়ে আলমারি তোলপাড় করে পুরানো লিস্টটা বার করে। বাড়ি ফোয়ারা পরি বইঘর পুরী, এমনকি পুরুলিয়ার পাহাড় ঘেরা জঙ্গলে সারাদিন ঘুরে ঘুরে পলাশফুল কুড়ানো অব্দি লালকালিতে কাটা। কিছুই বাকি নেই। সমস্ত ইচ্ছেগুলো পূরণ হয়ে গেছে। মানস অস্ফুটে বলল, ‘সুখের অসুখ।’স্বস্তিকা জানতে চায়, ‘কী দেখলে?”সুখের অসুখ। তোমার কথাই ঠিক।”মানে!’এ হল সব পাওয়ার অসুখ। আবার না-পাওয়ায় ফিরতে পারলে এ অসুখ থাকবে না।”ধ্যাত! এ আবার হয় নাকি!”আচ্ছা, তোমার কাছে এতদিনের সবচেয়ে মূল্যবান পাওয়া কী?’মানসের প্রশ্নের উত্তরে এক মুহূর্ত ভাবেনি স্বস্তিকা। বলল, ‘তুমি।”তোমার?”তুমি।”তারমানে আমাদের বিরহ দরকার।”সে আসবে কী করে?”বিচ্ছেদে।’বেশ তো। তুমি এখানে থাকো। আমি অন্য কোথাও থাকি।”ধুর। যেতে হলে আমি যাব। তুমি এখানেই থাকো। আলাদা থাকব বললেই তো হয় না। কত এরেঞ্জমেন্ট করতে হবে!”মেয়ে বলে এক্সট্রা এডভানটেজ চাই না। বাসের সিটের উপর “মহিলা” লেখাটাতেই আমার ঘোরতর আপত্তি।”তাহলে উপায়?”টস হোক। যে জিতবে সে চলে যাওয়ার অধিকার পাবে।”বেশ। টস হোক।’
মানসের আঙুলের টোকায় একটা এক টাকার কয়েন শূন্যে উঠল। স্বস্তিকা বলল, ‘টেল।’পড়ল হেড। কলকাতার মাঝরাত দেখল মানসের হাসি আর স্বস্তিকার থমথমে মুখ।স্বস্তিকা বলল, ‘এই বিচ্ছেদে পুনর্মিলন এপিসোড থাকবে না?”আলবাত থাকবে। থাকতেই হবে। বাঙালির কোন গপ্পে কোন ফিলিমে পুনর্মিলন নেই? কী গপ্পো কী ফিলিম, এটা থাকবেই। আফটার অল, এটা হচ্ছে বাঙালির কালচ্যারাল স্টেটমেন্ট। যে ক’টায় নেই, সেগুলোকে আর্ট-ফার্ট বলে কিছু একটা দেগে দিয়ে অফসাইড করে দিয়েছে।’
‘যাক গে, ওসব ছাড়ো। আমরা আবার কাছাকাছি ফিরব কী করে সেটাই বলো।’মানস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘যখন দু’জনের একসঙ্গে ফেরার ইচ্ছা হবে, তখন।”সেটা কীরকম!’ কণ্ঠে বিস্ময় স্বস্তিকার।’যখন আমার জন্য তোমার এবং তোমার জন্য আমার মন তিরে গাঁথা পাখির মতো ডানা ঝাপটাবে, তখন।”ধরো, দু’জনের একসঙ্গে এইরকম ফিলিং হল না, তাহলে?”ওয়েট। ওয়েট করে থাকতে হবে অপরপক্ষের ফিলিংয়ের জন্য। সিম্পল।’কেউ আর কোনো কথা বলল না। ঘুম নামল না কারো চোখে। জানালার শার্সির বাইরে ক্রমশ জেগে উঠল পাখির ডাক আর ভোর।
এক রোববার, মার্চ, ১৯৯৬
দিন যায়। হপ্তার মধ্যে একটা রোববার আসে।
সারা সকাল কাগজে কলমে কাটাকুটি। মতান্তর মনান্তর সহমত, শেষে একটা একিটা করে পয়েন্ট ফাইনাল। পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা, এমন কোনো অসুখ আছে শৃঙ্খলা ছাড়া যার সমাধান সম্ভব? বন্য ঘোড়া যত ক্ষীপ্রই হোক না কেন, তাকে লাগাম না-পরালে, আদবকায়দার ভিতর আনতে না পারলে ঘোড়দৌড়ের মাঠে সে জিততে পারে না। ঠিক সেরকম, এই বুকের ভিতর বেড়ে ওঠা অসুখের ওষুধ যদি বিচ্ছেদ হয়, তাহলে সেটা পালন করারও কিছু নিয়ম থাকা উচিৎ। না-হলে নইরাময়ের দিকে কীভাবে পৌছানো যাবে! তাই বিস্তর চিন্তাভাবনার পর একটা চুক্তিপত্র স্থির হল।
১। সপ্তাহে কেউ কাউকে দু’দিনের বেশি টেলিফোন করতে পারবে না।২। বিচ্ছেদ ভেঙে পরস্পরের কাছে ফিরে আসতে হলে দু’জনেরই সম্মতি থাকবে।৩। অফিস সংক্রান্ত কাজ ছাড়া কেউ কারো শহরে আসতে পারবে না। অন্য প্রয়োজনে আসতে হলে অপরের অনুমতি জরুরি। কিন্তু দেখা করা যাবে না।৪। কেউ কারো কাজে খবরদারি করবে না। অর্থের আদানপ্রদান নিষিদ্ধ।৫। টেলিফোন ছাড়া চিঠিপত্রে যোগাযোগ রাখা যাবে না।
অগাস্ট, ১৯৯৮
মানস খায়দায়, অফিস যায়। বাড়ি ফিরে ঘুমোয়। স্বস্তিকা খায়দায় স্কুলে যায়। বাড়ি ফিরে ঘুমোয়। দিন যায়। রাত যায়। মাস যায়। বছর যায়। মানস খায়দায়, অফিস যায়। বাড়ি ফিরে ঘুমোয়। স্বস্তিকা খায়দায়, স্কুলে যায়। বাড়ি ফিরে ঘুমোয়।
একদিন মানস দেখল, তার জুলফিতে সাদা রং। একদিন স্বস্তিকা দেখল, তার সিঁথির কাছে রূপোলি ঝিলিক। রাত্রিতে মানস ফোনে সাদা জুলফির কথা বলল। স্বস্তিকা বলল তার সিঁথির কথা। ইদানীং মানস একটা এন.জি.ও করেছে শিশুদের কল্যাণে।
কিছুদিন হল তো মানস টের পাচ্ছে মাঝে মাঝে তার বাঁ বুকে ব্যথা হয়। মাথা ঘোরায়। পরীক্ষার পর জানা গেল রক্তে চিনির পরিমান বেশি। সঙ্গে কোলেস্টেরল। স্বস্তিকা লক্ষ করেছে কিছুদিন যাবৎ উঠে দাঁড়ালেই মাথা ঘোরে। এক দু’বার ব্ল্যাক-আউট হয়েছে।
বলব কি বলব না করেও স্বস্তিকা একদিন টেলিফোনে শরীরের কথা জানাল মানসকে। মানসও বলল তার কথা। স্বস্তিকা বলল ‘চুক্তিপত্রটা কি সংশোধন করা যায়?’
মানস চুপ করে থাকে। স্বস্তিকা আর কথা বাড়াল না।
দিন যায়। মাস যায়। ঋতুচক্র ঘোরে অবিরাম।
মে, ২০০৮
প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র‍্যাচুয়িটির সব টাকা এসে যেতে এন.জি.ও টা আরও শক্তিশালী হয়েছে। মানস আদিবাসী ছেলেমেয়েদের ছোটো ছোটো এডুকেশনাল ট্যুরেও নিয়ে যেতে পারছে। ওদের ঠোঁটে ফুটে ওঠা হাসি মানসকে এক পার্থিব আনন্দ দেয়। তবে শরীর আর সেভাবে সঙ্গ দিচ্ছে না। পৃথিবীতে এত হাওয়া আথচ তার ফুসফুস সেই হাওয়া খুঁজে পায় না। মানস ভাবে, দিন গড়ালে বাতাসও কি পাথরের মতো ভারি হয়ে ওঠে!
অক্টোবর, ২০১৪
কলকাতা এবং ঘাটশিলায় সেই দুটো পুরানো টেলিফোন আজও আছে। তবে দু’জনের হাতেই উঠে এসেছে স্মার্টফোন। স্লিম শরীর। রঙিন স্ক্রিন। ছুঁয়ে দিলেই দূর চলে আসে কাছে। বুকের কথা উড়তে উড়তে চলে যায় দূরে। পরস্পরের নম্বর জানলেও সেই টেলিফোনেই কথা হয় চুক্তিপত্র মোতাবেক। হপ্তায় দু’দিন।
ইদানীং দু’জনেরই ফেসবুকে একাউন্ট হয়েছে। একে অন্যকে জানিয়েছে। কিন্তু কেউ কারো প্রোফাইল খুঁজে দেখেনি। কেউ কাউকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়নি। এই ভার্চুয়াল পৃথিবীতে বন্ধু নয় তারা।
আজ স্বস্তিকার অবসর। ডেটটা মনে ছিল মানসের।
রাতে ঘাটশিলার টেলিফোন শুভেচ্ছা জানাল কলকাতার টেলিফোনকে। ঘাটশিলার কণ্ঠস্বর বলল, ‘চুক্তিপত্র সংশোধনের কথা ভাবা যেতে পারব।’
কলকাতার কণ্ঠস্বর নিরুত্তর থাকল। ঘাটশিলার কণ্ঠস্বর বলল, ‘ইনফ্যাক্ট তুমিই একদিন এই প্রস্তাব রেখেছিলে!’কলকাতার কণ্ঠস্বর নিরুত্তর থাকল। ঘাটশিলার রিসিভারে উড়ে এল মৃদু হাসির শব্দ। সে হাসিতে উপেক্ষা নাকি বিষাদ – পড়তে পারল না মানস।
দিন যায়। মাস যায়। ঋতুচক্র ঘোরে অবিরাম।
ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
বসন্তকাল। পরপর দু’সপ্তাহ রিসিভারে রিং হল। কেটে গেল। আশ্চর্য হল মানস। এমন তো কখনও হয় না! তৃতীয় সপ্তাহেও রিং হল কলকাতায়। কিন্তু নাহ, স্বস্তিকা নিশ্চুপ। তাহলে কি অভিমান! তা কীকরে হয়!
তখন ফেসবুক ছিল না। স্বাভাবিকভাবে চুক্তিপত্রে ফেসবুকের উল্লেখ নেই। ভিতরে ভিতরে অধৈর্য হয়ে উঠল মানস।
এখন মধ্যরাত। ঘাটশিলার পাহাড়ি টিলাগুলোর উপর নিঃশব্দ জ্যোৎস্না। এই বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে নিস্তব্ধ পাহাড়ি জ্যোৎস্না আর শব্দহীন অন্ধকার দেখে কত নির্ঘুম রাত পার হয়ে গেছে, সে শুধু মানসই জানে। মানস ঠিক করল, টস করবে। ওই কয়েন ঠিক করে দেবে ফেসবুকে স্বস্তিকার প্রোফাইল সার্চ করবে কী না! প্রথমে স্বস্তিকার হয়ে বলে নেবে হেড নাকি টেল। তারপর যা রেজাল্ট হবে তার উল্টোটা হলে তার জিৎ। নাহলে হার। জিৎ হলে ফেসবুকে স্বস্তিকার প্রোফাইল সার্চ করার অধিকার জন্মাবে। নাহলে তাকে আমৃত্যু অপেক্ষা করে থাকতে হবে টেলিফোনের জন্য।
মানস তৈরি হল সেই কয়েন নিয়ে। স্তব্ধ এই মধ্যরাতের চরাচরে হাত কি একটু কেঁপে উঠল! জিত নাকি হার – কী অপেক্ষা করে আছে তার জন্য! মনে আসা ক্ষণিকের দোলাচল দূরে সরিয়ে শক্ত হল মানস। সে বারেও কলকাতার মধ্যরাতে সেই-ই তো কয়েন তুলে নিয়েছিল নিজের মুঠোয়।
টস করল মানস। আর তখনই ঘটল এক আশ্চর্য ম্যাজিক! ধাতুর চাকতিটা শূন্যে পাক খেতে খেতে স্থির হয়ে গেল শূন্যেই। শূন্যে ঝুলছে মুদ্রা। ঝুলন্ত মুদ্রার ভিতর বদল হচ্ছে রেখার। রেখার ভিতর জেগে উঠল স্বস্তিকার মুখ। সেই মুখ কী আশ্চর্য মনখারাপের! ভয়ানক কাঁপতে লাগল মানস। রেখাময় ওই মুখ কী যেন বলছে! মানস কান পেতে শোনার চেষ্টা করল মুদ্রার অস্পষ্ট স্বর। ভাঙা ভাঙা শব্দে যেন শোনা গেল, ‘চুক্তিপত্র সম্পদের সুরক্ষা হয়তো দেয়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে অচল। সম্পর্ক থাকে বুকে। বুকের ভিতর…’
মানস স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ল চেয়ারে। ক্রমশ তার ক্লান্ত হাত উঠে আসছে অবসন্ন বুকের ওপর।

Leave a Reply

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *