20190929_135107_0000

কৃষ্ণচন্দ্র দে, সঙ্গীত মহীরুহ – সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় (১ম অংশ)

রেকর্ডে, অভিনয় মঞ্চে, ঘরোয়া মেজাজে বা বৈঠকি আসরে বাংলা গানের নবযুগের সূচনা যাঁরা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে মহীরুহ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দে (১৮৯৩ – ১৯৬২) মহাশয়; যিনি ‘কে.সি. দে’ নামে সারা দেশে পরিচিত ছিলেন। 
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মাষ্টমীর দিন কলকাতার মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে তাঁর জন্ম। বাবা শিবচন্দ্র দে-র ছোটো ছেলে ছিলেন তিনি। যেহেতু কৃষ্ণের জন্মদিনে ছেলের জন্ম, তাই বাড়ির লোকজন সাধ করে নাম রাখলেন কৃষ্ণচন্দ্র, আদর করে মা-মাসিরা ডাকতেন ‘কেষ্ট’। যদিও বাড়িতে গান বাজনার কোনও চল ছিল না কোনোদিন, কিন্তু আজন্ম গানবাজনার প্রতি তাঁর ছিল এক তীব্র আকর্ষণ এবং খুব ছোটো থেকেই এক অদ্ভূত লাবণ্যময় কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন তিনি। মাত্র তেরো বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান চিরতরে এবং সংগীতকেই দৃঢ়ভাবে জীবনের অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর মানসিক অবস্থা বোঝাতে তিনি একটি গান খুব গাইতেন, “বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে ভিতর দুয়ার খোলা।” আজ কৃষ্ণচন্দ্র দে মশায়ের সংগীত জীবন ও নাট্যমঞ্চের সাথে যোগাযোগ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব।
পাথুরিয়াঘাটার জমিদার তথা সংগীতজগতের এক দিকপাল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হরেন্দ্রনাথ শীল মশায়। গোটা কলকাতায় সকলেই তাঁকে জানত তাঁর দানধ্যান, পরোপকারী স্বভাব, সহৃদয়তা এবং বাবুয়ানির কারণে। ওনার বাড়িটিই আজকের কলকাতার রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতাল। কৃষ্ণচন্দ্রের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে শীলমশাই তাঁকে বারো বছর বয়সে তাঁর শখের অপেশাদার নাট্যগোষ্ঠীতে নিয়ে আসেন এবং গানবাজনার তালিম শুরু করান। যেসব গুণী মানুষের কাছে তিনি সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে দর্জিপাড়ার  উকিল শশীভূষণ দে ছিলেন অন্যতম। পেশায় উকিল হলে কী হবে, খেয়াল গানে তাঁর সমকক্ষ সে সময় খুঁজে পাওয়া ভার। পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করে তা আয়ত্ব করেন কৃষ্ণচন্দ্র। একই সঙ্গে শ্রীসতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শেখেন টপ্পা গান। এই সতীশবাবু শুধু মাত্র টপ্পা গাইয়েই ছিলেন তা নয়, তবলা বাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল অসীম। ফলে সুরের ফুলকে তাল, লয়কারীর সুতায় কীভাবে গাঁথতে হয় তা হাতে ধরে কৃষ্ণচন্দ্রকে শেখান সতীশবাবু।  
শিক্ষাই তো শেষ কথা নয়, সঙ্গে থাকে আর্থিক চিন্তাও। আর্থিকভাবে অনটনগ্রস্ত কৃষ্ণচন্দ্র যখন উপায় খুঁজছেন, তখন হঠাৎ করে তাঁর পরিচয় হয় দেশ বিখ্যাত কুস্তিগীর এবং সঙ্গীত রসিক গোবর গুহ-র সঙ্গে। তাঁর গান শুনে গোবর বাবু সাথে সাথে প্রস্তাব দেন কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীত শিক্ষার ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতার এবং তিনি তাঁকে সাথে ক’রে নিয়ে যান সে যুগের বিখ্যাত সরোদিয়া ও খেয়ালিয়া কেরামতুল্লা খাঁ সাহেবের কাছে। এর পরে দীর্ঘ সাত বছর গোবরবাবুর আর্থিক সহায়তায় কৃষ্ণচন্দ্র তালিম নিতে থাকেন খাঁ সাহেবের কাছে। গোবরবাবুর সাথে এই সম্পর্ক ক্রমশ হৃদ্যতায় পরিণত হয়, এবং অভিন্নহৃদয় বন্ধুত্বের সম্পর্ক বাকি জীবন দুজনের মধ্যেই বজায় থাকে। এরই পাশাপাশি তিনি ফিদা হোসেন খাঁ-র কাছে তবলা শিখতে শুরু করেন এবং শিবা পশুপতি মিশ্রের কাছে খেয়াল। ধ্রুপদ-ধামার ইত্যাদি গানের ধারা তিনি পান ওস্তাদ দবীর খাঁ (মিয়া তানসেনের বংশধর) সাহেবের কাছে, ঠুমরি গান শেখেন ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁর (গওহরজানের ছাত্র) কাছে, আর পরবর্তীকালে খেয়ালের তালিম নিতেন খলিফা বদল খাঁ সাহেবের কাছে। এই বদল খাঁ ছিলেন পাঞ্জাবি ওস্তাদ, ভারী অদ্ভুত ছিল তাঁর শেখাবার পদ্ধতি– একটু শোনাই সেই গল্প। আমার ওস্তাদ রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ও যেতেন তাঁর কাছে শিখতে। খাঁ সাহেবের বয়স তখন নব্বই, ওনার সামনে একটা থালা থাকত, তাতে দুটি রুপোর টাকা দিতে হত। তাঁর কাজের লোক একজন থাকত সাথে, টাকা ঠিক ঠাক দিলে সে ওস্তাদকে ইশারা করে বলত যে হ্যাঁ, টাকা পড়েছে। তখন ওস্তাদজি সামনে রাখা সারেঙ্গিটা তুলে যা মনে আসত বাজাতেন, গেয়েও শোনাতেন। যতক্ষণ মেজাজ থাকত সে রাগ-রাগিনীতে ততক্ষণ বাজাতেন, তার পরেই চুপ! আর না! এই সময়ের মধ্যে সেটি শিখে নিতে হবে, নইলে গেল। তখন না ছিল রেকর্ড করা, না বারবার দেখান। তাই তানসেন হতে না পারো ক্ষতি নেই, গাইতে গেলে “কানসেন” হতেই হত! যে কথা বলছিলাম- সারাদিনে দশ ঘণ্টা রেওয়াজী কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে তখন তাল, লয়, সুর নিয়ে যেমন খুশি খেলে যাওয়া ছিল নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতোই সহজ। এইভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং নানান গুণীজনের কাছে নিয়মিত ভাবে নাড়া বেঁধে সংগীত শিক্ষা করে পরবর্তী পনেরো বছরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার এক অবিসংবাদী গায়ক হিসেবে। ছেলেবেলার সেই আদরের কেষ্ট, বাঙালির ঘরে ঘরে মা দিদিমার কাছে ভালোবাসার ডাকে পরিচিত হয়েছিলেন ‘কানাকেষ্ট’ নামে। রেকর্ডে লেখা থাকত কৃষ্ণচন্দ্র দে- অন্ধ গায়ক, অথবা কে.সি.দে– দি ব্লাইণ্ড সিঙ্গার।

কৃষ্ণচন্দ্র দে


প্রতিদিন সকাল ন’টা থেকে তাঁর বাড়িতে গানবাজনার আসর বসত, চলত সেই বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। গানের বাড়ি হিসেবেই “দে বাড়ি” তখন পরিচয় পায়। সে আসরে গৌরিশঙ্কর ওস্তাদ বাজাতেন সারেঙ্গি, সতীশচন্দ্র দত্ত বা দানীবাবু বাজাতেন পাখোয়াজ, জমিরুদ্দিন খাঁ, আজীম খাঁ প্রভৃতি ওস্তাদরা চলে আসতেন সকালেই। দুপুরবেলা ওনার মা নিজে থালা ভর্তি লুচি ও প্রয়োজনমাফিক তরিতরকারি নিয়ে হাজির হতেন গানের ঘরে। বলতেন, খাওয়া দাওয়া না হলে কি গান হয়? তোমরা পেটপুরে খাও এখন!
১৯১১ সাল, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড “আর চলে না চলে না মা গো।” পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হরেন্দ্রনাথ শীলমশাই। তবে রেকর্ডটি তেমন চলেনি, যদিও গান ও গায়কি ছিল অনবদ্য। এরপর দ্বিতীয় রেকর্ড, “দীন তারিণী তারা”– এ গান তাঁর নিজের রচিত। মনের অনুযোগ প্রকাশ করে গানে তিনি বলেছিলেন “পাঠাইলি যদি এ ভব সংসারে কেন চিরপরাধীন করিলি আমাকে?” এ রেকর্ড প্রকাশ হতেই বাজারে হৈহৈ পড়ে যায় গানটি নিয়ে এবং এর জেরেই তিনি গ্রামোফোন কোম্পানীতে স্থায়ী শিল্পী হিসেবে নিয়োজিত হন ও নানান শাখার সংগীত রেকর্ড করতে থাকেন। শুধু মাত্র বাংলা নয়, হিন্দি, উর্দু, গুজরাটি ইত্যাদি নানান ভাষায় প্রায় হাজার দুয়েক রেকর্ড করেন তিনি। বিশেষ করে গুজরাটি ভাষায় গাওয়া তাঁর নাট্য-সংগীত অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। বাংলায় স্বপন যদি মধুর এমন (এইটি কৃষ্ণচন্দ্রের সুর, সত্যের সন্ধান নাটকের গান), অথবা ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে, সখী লোকে বলে কালো, ইত্যাদি গান তো আজও অমর। এই প্রসঙ্গে আরও একটি গানের কথা বলতেই হয়। স্বাধীনতার ঠিক পরেই মোহিনী চৌধুরীর লেখা ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি নিজে সুর করে গাইলেন কৃষ্ণচন্দ্র। ব্যাণ্ডের ছন্দে তালে আজও এই গান ও তার সুর শহীদ তর্পণের একমাত্র সঙ্গীত আমাদের কাছে! 

ছেলেবেলার সেই আদরের কেষ্ট, বাঙালির ঘরে ঘরে মা দিদিমার কাছে ভালোবাসার ডাকে পরিচিত হয়েছিলেন ‘কানাকেষ্ট’ নামে। রেকর্ডে লেখা থাকত কৃষ্ণচন্দ্র দে- অন্ধ গায়ক, অথবা কে.সি.দে– দি ব্লাইণ্ড সিঙ্গার।


এইচ.এম.ভি তে তিনি যোগদান করেন রেজিস্টার্ড আর্টিস্ট হিসেবে এবং তাঁর উদ্যোগেই প্রথম প্রতিটি  শিল্পীর জন্য রয়্যালটি ব্যবস্থা চালু হয়। এই সময় এমন দিনও গেছে যখন একই দিনে ১৫ থেকে ১৬টি গানের রেকর্ড করেছেন একটানা। এছাড়াও বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স ও অল ইণ্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স বোর্ডেরও তিনি সদস্য ছিলেন।
কৃষ্ণচন্দ্রের গানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু আলোচনা করা যেতেই পারে এই অবসরে। ১৯২০ সালে ২৩ নম্বর ওয়েলিংটন স্ট্রীটে সে যুগের সঙ্গীত রসিক বেচারাম চন্দ্র তাঁর বাড়িতে এক বিরাট শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই বেচারাম চন্দ্র হলেন প্রতাপ চন্দ্রের ঠাকুর্দা। সেই সম্মেলনে গান গেয়ে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন কৃষ্ণচন্দ্র! উপস্থিত গুণী শ্রোতারা একবাক্যে তাঁর দক্ষতা, গায়কি এবং প্রতিভার কথা স্বীকার করে নেন। তাঁর সুমধুর কণ্ঠস্বর, অথচ জোরালো জোয়ারী আওয়াজ এবং তিন সপ্তকে সমান দক্ষতায় বিচরণ সকলকে স্তম্ভিত করে দেয়! গানের ভাবের সঙ্গে সুরের এক আশ্চর্য সঙ্গতি, যা সংগীতের নাটকীয়তাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিত, তা ছিল কৃষ্ণচন্দ্রের এক আশ্চর্য কুশলতা। সাধারণ বাংলা গানকেও শাস্ত্রীয় সুরের মেজাজে এমনভাবে জারিত করতেন, যে মানুষ মোহিত হয়ে যেত। অথচ সে পরিবশনায় না থাকত মারপ্যাঁচের কুস্তি, না অতিরঞ্জিত পাণ্ডিত্যের আহাম্মকি। উদাত্ত গলার তার সপ্তকের পরিবেশনাকে তিনি কখনই কৃত্রিম ভাবে নমনীয় করতেন না, আবার তার ঔদাত্ত কখনই মাত্রাও ছাড়িয়ে যেত না। কণ্ঠস্বরের মডিউলেশন ছিল যথার্থ। এই কারণেই হেমেন্দ্রকুমার রায় তাঁকে “গায়ক কবি” বলে ডাকতেন। তাঁর একটি গান যা পরিপূর্ণভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারায় নিবদ্ধ, “গেঁথেছি ফুলের মালা” এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যা বলার নয়। কারণ কিন্তু ছিল তার যথাযথ পরিবেশনা। শাস্ত্রীয় ভাবকে পিছনে ফেলে অন্তরের আকুতি যে জায়গায় প্রকাশিত হয়েছিল এই গানে, তা আপামর জনসাধারণকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের দোলায়। 

(ক্রমশঃ)

দ্বিতীয় অংশ

Leave a Reply

11 Responses

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *